দীর্ঘদিন ধরে বাংলার রাজনীতিতে তৃণমূল কংগ্রেস মানেই ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দল, সংগঠন, আন্দোলন— সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন তিনিই। গ্রামবাংলার বহু মানুষ দলকে নয়, সরাসরি ‘দিদি’কে ভোট দিতেন বলেই মনে করতেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। কিন্তু ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর সেই আত্মবিশ্বাসে প্রথম বড় ধাক্কা লাগে।
সেই নির্বাচনে তৃণমূল ২২টি আসন পেলেও বিজেপি ১৮টি আসন জিতে বাংলার রাজনীতিতে শক্ত জমি তৈরি করে। ফল প্রকাশের কয়েক দিন পর সাংবাদিক বৈঠকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছিলেন, তিনি মুখ্যমন্ত্রীর পদ ছাড়তে চেয়েছিলেন। পরে বিজেপি নেতা বাবুল সুপ্রিয় সেই প্রসঙ্গে কটাক্ষ করে বলেছিলেন, মমতা নিজেই নিজেকে পদত্যাগ করতে দেননি। সেই মন্তব্য ঘিরে তুমুল চর্চা হয়েছিল রাজনৈতিক মহলে।
এরপরই তৃণমূলের নির্বাচনী কৌশলে বড় পরিবর্তন আসে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরামর্শে দায়িত্ব পায় আইপ্যাক (IPAC)। প্রশান্ত কিশোরের নেতৃত্বে শুরু হয় নতুন ধরনের রাজনৈতিক প্রচার। প্রথমে ‘বাংলার গর্ব মমতা’ স্লোগান সামনে আনা হলেও, অনেকের মতে সেই প্রচারে মানুষের সঙ্গে সংযোগের বদলে আত্মতুষ্টির ছবি বেশি ফুটে উঠেছিল।
পরে ‘দিদিকে বলো’ কর্মসূচি এনে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের চেষ্টা করে তৃণমূল (IPAC)। হেল্পলাইনের মাধ্যমে অভিযোগ জানানোর সুযোগ দেওয়া হয়। রাজনৈতিক মহলের মতে, এই কর্মসূচি মানুষের মধ্যে যথেষ্ট সাড়া ফেলেছিল।
এরপর ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ এবং ‘দুয়ারে সরকার’-এর মতো প্রকল্পকে সামনে রেখে নতুন করে জনসংযোগ গড়ে তোলে তৃণমূল। বিশেষ করে মহিলা ভোটব্যাঙ্ক ধরে রাখতে এই প্রকল্পগুলি বড় ভূমিকা নেয় বলে মনে করা হয়। ২০২১ সালের নির্বাচনে বিপুল জয়ের পর আইপ্যাকের প্রভাব আরও বাড়তে শুরু করে।
প্রশান্ত কিশোর সরে যাওয়ার পর আইপ্যাকের দায়িত্বে আসেন প্রতীক জৈন। তৃণমূলের অন্দরে তখন নতুন সমীকরণ তৈরি হতে থাকে। অনেক নেতা অভিযোগ করতে শুরু করেন, সংগঠনের চেয়ে আইপ্যাকের (IPAC) কর্মীদের গুরুত্ব বাড়ছে। জেলায় জেলায় প্রার্থী বাছাই থেকে প্রচারের কৌশল— সবকিছুতেই বাড়তে থাকে ক্যামাক স্ট্রিটের প্রভাব।
দলের একাংশের অভিযোগ, নতুন করে যাঁরা আইপ্যাকে যোগ দেন তাঁদের অনেকেই বাংলা ভাষা ও বাংলার সামাজিক বাস্তবতা ঠিকভাবে বুঝতেন না। সেই কারণে প্রচারের অনেক পরিকল্পনাই মানুষের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করতে ব্যর্থ হয়।
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনেও নতুন স্লোগান আনে তৃণমূল। ‘জনগণের গর্জন, বাংলাবিরোধীদের বিসর্জন’ স্লোগান সামনে এলেও, অনেকের মতে সেই প্রচারে আবেগের ঘাটতি ছিল। পরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই সভায় সেই স্লোগান বদলে দেন।
এবারের বিধানসভা নির্বাচনে প্রচারে আরও নতুনত্ব আনার চেষ্টা করে আইপ্যাক (IPAC)। বাড়ির দরজায় লাগানোর জন্য বিশেষ স্টিকার এবং তৃণমূলের উন্নয়নকে কেন্দ্র করে লুডো খেলার মতো প্রচার সামগ্রী পাঠানো হয়। কিন্তু দলের বহু কর্মীর মতে, এই ধরনের পরিকল্পনা বাস্তবের সঙ্গে মিল খায়নি। সাধারণ মানুষের মধ্যেও সেই প্রচার খুব একটা সাড়া ফেলতে পারেনি।
অন্যদিকে বিজেপি দুর্নীতি, অনুপ্রবেশ, বেতন কমিশন এবং আইনশৃঙ্খলার মতো ইস্যু তুলে সরাসরি মানুষের সমস্যাকে সামনে এনে প্রচার চালায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, সেই প্রচার মানুষের মনে বেশি প্রভাব ফেলেছে।
তৃণমূলের অন্দরে এখন বড় প্রশ্ন, দল কি অতিরিক্তভাবে ডেটা এবং পেশাদারি কৌশলের উপর নির্ভর করে ফেলেছিল? অনেকেই মনে করছেন, শেষ পর্যন্ত মানুষের আবেগ এবং মাটির রাজনীতির জায়গাটা হারিয়ে ফেলেছিল তৃণমূল। আর সেই সুযোগই কাজে লাগিয়েছে বিজেপি।











