মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের শীর্ষ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেই নিহত হওয়ার পরও যুদ্ধ থামার কোনও লক্ষণ নেই (Middle East Crisis)। প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে চলা সংঘাতে বড় ক্ষতি হলেও ইরান পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন জায়গায়। এই পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের শক্তির বড় কারণ তাদের বিশেষ সামরিক কৌশল, যার নাম ‘মোজাইক প্রতিরক্ষা’।
এই কৌশল তৈরি করেছিলেন ইরানের সামরিক কৌশলবিদ এবং প্রাক্তন সেনা কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলি জাফরি। বহু বছর আগে তিনি এমন একটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলেন যাতে দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হলেও যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় (Middle East Crisis)।
ইরানের বিদেশমন্ত্রী সাইয়েদ আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছেন, গত দুই দশক ধরে মার্কিন সেনাবাহিনীর যুদ্ধ এবং তাদের সাফল্য ও ব্যর্থতা বিশ্লেষণ করেই এই প্রতিরক্ষা কৌশল তৈরি করা হয়েছে (Middle East Crisis)। তাঁর কথায়, রাজধানীতে হামলা হলেও বা বড় নেতারা নিহত হলেও ইরানের যুদ্ধ চালানোর ক্ষমতা শেষ হয়ে যায় না। কারণ এই ব্যবস্থায় সামরিক শক্তি বিভিন্ন স্তরে ভাগ করে রাখা হয়েছে।
মোহাম্মদ আলি জাফরি ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর প্রধান ছিলেন দুই হাজার সাত থেকে দুই হাজার উনিশ সাল পর্যন্ত। ইরানের ইসলামি বিপ্লবের পর তিনি এই বাহিনীতে যোগ দেন এবং ধীরে ধীরে গুরুত্বপূর্ণ পদে উঠে আসেন। পরে তিনি দেশের সামরিক কৌশল বদলে দেওয়ার কাজে বড় ভূমিকা নেন।
ইরান–ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা এবং দুই হাজার তিন সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনীর ইরাক আক্রমণের ঘটনাও তাঁর কৌশল তৈরিতে বড় প্রভাব ফেলেছিল বলে জানা যায়। ওই সময় দ্রুতই ইরাকের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই ইরান বুঝতে পারে, এক জায়গায় ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকলে তা সহজে ধ্বংস করা সম্ভব (Middle East Crisis)।
সেই কারণেই ‘মোজাইক প্রতিরক্ষা’ কৌশলে সামরিক শক্তিকে বিভিন্ন অঞ্চল এবং ইউনিটে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি ইউনিট প্রায় স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। ফলে কোনও এক জায়গায় বড় হামলা হলেও পুরো ব্যবস্থাটি ভেঙে পড়ে না।
এই ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী, স্থানীয় বাহিনী, ক্ষেপণাস্ত্র ইউনিট, নৌবাহিনী এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক কমান্ড। কোনও কারণে শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলেও স্থানীয় ইউনিটগুলো নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে।
এই বাহিনীকে দেশের বিভিন্ন প্রদেশে ভাগ করে রাখা হয়েছে। প্রতিটি প্রাদেশিক ইউনিটের নিজস্ব অস্ত্র, গোয়েন্দা তথ্য এবং কমান্ড ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে একাধিক স্তরে প্রতিরক্ষা গড়ে ওঠে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই কৌশলের মূল উদ্দেশ্য ছিল এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা যাতে বাইরের শক্তি সহজে ইরানের সামরিক কাঠামো ভেঙে দিতে না পারে। একই সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্রকে দীর্ঘ এবং জটিল করে তোলাও এই কৌশলের একটি লক্ষ্য।
এই ব্যবস্থায় নিয়মিত সেনাবাহিনী, অনিয়মিত যুদ্ধ, স্থানীয় প্রতিরোধ এবং দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত—সবকিছুকে একসঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। ফলে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের সঙ্গে যুদ্ধ হলেও ইরান দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আফগানিস্তান এবং ইরাকে মার্কিন হামলার পর যে দ্রুত শাসন পরিবর্তন হয়েছিল, সেই অভিজ্ঞতাই ইরানকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করে। তখন থেকেই তারা এমন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করতে শুরু করে যাতে বাইরের হামলায় দেশের সামরিক শক্তি সহজে ভেঙে না পড়ে।












