২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে নন্দীগ্রামকে ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র উত্তেজনা ছিল। ১৮ জানুয়ারি তেখালির সভায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নন্দীগ্রাম থেকে নির্বাচনে লড়ার কথা ঘোষণা করেছিলেন। সেই ঘোষণার পর নন্দীগ্রামে তাঁর সমর্থনে ভোট সংগঠিত করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন বলে দাবি করেছেন বর্তমান নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনের কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধান (Milan Pradhan)।
মিলনের দাবি, মমতা নন্দীগ্রাম থেকে প্রার্থী হচ্ছেন শুনে তিনি (Milan Pradhan) তাঁর দীর্ঘদিনের সংগঠনের ভোটের একটি অংশ মমতার পক্ষে আনার চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর বক্তব্য, প্রায় চার হাজার ভোট মমতার পক্ষে নিয়ে আসার দায়িত্ব নিতে চেয়েছিলেন তিনি। সেই খবর সরাসরি মমতার কাছে পৌঁছে দেওয়ারও চেষ্টা করেছিলেন বলে দাবি তাঁর।
কিন্তু মিলনের (Milan Pradhan) অভিযোগ, সেই বার্তা কালীঘাটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে পৌঁছয়নি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি যে সমর্থনের কথা জানিয়েছিলেন, তা তৃণমূলনেত্রীর কাছে পৌঁছলে নন্দীগ্রামের নির্বাচনী সমীকরণে তার প্রভাব পড়তে পারত।
২০২১ সালের সেই নির্বাচনে নন্দীগ্রাম ছিল রাজ্যের সবচেয়ে আলোচিত কেন্দ্রগুলির একটি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে বিজেপির হয়ে লড়েছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত ফলে শুভেন্দু ১ লক্ষ ৯ হাজার ৬৭৩ ভোট এবং মমতা ১ লক্ষ ৭ হাজার ৯৩৭ ভোট পান। অর্থাৎ ব্যবধান ছিল ১ হাজার ৭৩৬ ভোট।
তবে বিভিন্ন সূত্রে ২০২১ সালের নন্দীগ্রামের ফলের ব্যবধান নিয়ে ভিন্ন সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল। গণনার দিন সার্ভারের সমস্যা এবং ফল ঘোষণাকে ঘিরে টানাপোড়েনও হয়েছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পরে গণনায় কারচুপির অভিযোগ তুলেছিলেন এবং পুনর্গণনার দাবি জানিয়েছিলেন। নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত ঘোষণায় অবশ্য শুভেন্দুকেই বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।
মিলনের (Milan Pradhan) দাবি, তিনি যে প্রায় চার হাজার ভোট মমতার পক্ষে আনার কথা ভেবেছিলেন, সেই খবর মমতার কাছে পৌঁছতে দেওয়া হয়নি। তাঁর অভিযোগের নেপথ্যে তৃণমূলের অন্দরের একটি অংশের ভূমিকা ছিল।
এই প্রসঙ্গে সম্প্রতি কংগ্রেসে যোগ দেওয়া মানিক ফকিরের নামও সামনে এসেছে। মানিকের দাবি, তিনিও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে নন্দীগ্রামের পরিস্থিতির খবর পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। শুধু কালীঘাট নয়, নবান্নের কাছেও বিষয়টি জানানোর চেষ্টা করেছিলেন বলে দাবি তাঁর।
মানিকের বক্তব্য, অন্তত দুজন মন্ত্রী, একজন সাংসদ এবং এক জন পুলিশ আধিকারিকের মাধ্যমে খবর পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তাঁর কথায়, সেই বার্তা শেষ পর্যন্ত মমতার কাছে পৌঁছনো সম্ভব হয়নি। এই প্রসঙ্গেই তিনি ‘দুর্ভেদ্য বর্ম’ ভেদ করতে না পারার কথা বলেছেন।
তৃণমূলের একটি সূত্রও দাবি করেছে, ২০২১ সালের নন্দীগ্রাম নির্বাচনে দলের অন্দরে নানা ধরনের সমীকরণ কাজ করেছিল। দলের এক রাজ্য নেতার বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, সমর্থন করতে চাওয়া ব্যক্তিদের বার্তাও সবসময় শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে পৌঁছয়নি। তবে এই অভিযোগগুলির স্বাধীন ভাবে সত্যতা যাচাই করা যায়নি।
পাঁচ বছর পর নন্দীগ্রাম আবার উপনির্বাচনের কেন্দ্র। ২০২৬ সালের এই উপনির্বাচনে কংগ্রেসের প্রার্থী হয়েছেন মিলন প্রধান। কংগ্রেস তাঁর নাম ঘোষণা করেছে সেপ্টেম্বর মাসে।
তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে মিলনকে (Milan Pradhan) ঘিরে আর একটি বিষয়ও আলোচনায় রয়েছে। ২০০৭ সালের নন্দীগ্রাম আন্দোলন পর্বের পুরনো মামলায় গ্রেফতার হওয়ার পর তাঁকে জেল হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে আদালত। ৬ অক্টোবর নন্দীগ্রামে উপনির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও ভোটের আগে তাঁর জেল হেফাজত নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
ফলে ২০২১ সালের নন্দীগ্রামের সেই হাইভোল্টেজ লড়াইয়ের সঙ্গে ২০২৬ সালের উপনির্বাচনের একটি অদ্ভুত যোগসূত্র তৈরি হয়েছে। পাঁচ বছর আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষে ভোট সংগঠিত করার দাবি করা মিলন প্রধানই এখন নন্দীগ্রামে কংগ্রেসের প্রার্থী। আর সেই সময় মমতার কাছে তাঁর বার্তা আদৌ পৌঁছেছিল কি না, পৌঁছলে ফলাফলে কোনও পরিবর্তন হত কি না, তা নিয়ে এখন রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
তবে চার হাজার ভোটের সমর্থনের দাবি, সেই বার্তা আটকে যাওয়ার অভিযোগ এবং তার সম্ভাব্য নির্বাচনী প্রভাব—সবই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য। ২০২১ সালের নন্দীগ্রাম নির্বাচনের সরকারি ফল অবশ্য নির্বাচন কমিশন শুভেন্দু অধিকারীর জয় হিসেবেই ঘোষণা করেছিল।












