বিশ্ব ফুটবলের (FIFA World Cup 2026) ইতিহাসে এমন গল্প খুব কমই দেখা যায়। যে মানুষ এক সময় একটি ভাড়া করা টেলিভিশনের সামনে দাঁড়িয়ে দিয়েগো মারাদোনার খেলা দেখে ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন, আজ তিনিই নিজের দেশকে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে তুলে ইতিহাস গড়েছেন। তিনি কেপ ভার্দে জাতীয় দলের প্রধান কোচ পেদ্রো লেইতাও ব্রিটো, যিনি সবার কাছে বুবিস্তা নামে পরিচিত।
মাত্র পাঁচ লাখ মানুষের ছোট্ট দেশ কেপ ভার্দে (FIFA World Cup 2026)। সেই দেশের বোয়া ভিস্তা দ্বীপের একটি প্রত্যন্ত গ্রামে বড় হয়ে ওঠেন বুবিস্তা। ছোটবেলায় তাঁদের বাড়িতে টেলিভিশন ছিল না। উনিশশো ছিয়াশি সালের বিশ্বকাপ দেখার জন্য গ্রামের মানুষ মিলে একটি টেলিভিশন ভাড়া করেছিলেন। সেই টেলিভিশনের পর্দায় মারাদোনার জাদুকরী ফুটবল দেখে বদলে যায় এক কিশোরের জীবন।
কিন্তু স্বপ্নের পথ মোটেও সহজ ছিল না। সংসারে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। ফুটবল কেনার সামর্থ্যও ছিল না। তাই তাঁর মা মোজা দিয়ে বল তৈরি করে দিয়েছিলেন। সেই বল নিয়েই শুরু হয়েছিল তাঁর ফুটবল জীবন। ধীরে ধীরে দেশের হয়ে খেলার সুযোগ পান। দীর্ঘ এগারো বছর জাতীয় দলের অধিনায়কের দায়িত্বও সামলান। খেলোয়াড় হিসেবে যে স্বপ্ন পূরণ হয়নি, আজ কোচ হিসেবে সেই স্বপ্নই সত্যি করছেন তিনি (FIFA World Cup 2026)।
দেশের বিভিন্ন ক্লাবে সফলভাবে কাজ করার পর দুই হাজার কুড়ি সালের জানুয়ারিতে কেপ ভার্দে জাতীয় দলের কোচ হন বুবিস্তা। তাঁর হাত ধরেই বদলে যায় দলের ভাগ্য। টানা দু’বার আফ্রিকা কাপের মূল পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে কেপ ভার্দে। দুই হাজার তেইশ সালে প্রথমবার আফ্রিকা কাপের কোয়ার্টার ফাইনালেও পৌঁছয় দলটি।
এবার বিশ্বকাপে প্রথম অংশগ্রহণ করেই নতুন ইতিহাস লিখেছে কেপ ভার্দে। স্পেন, উরুগুয়ে এবং সৌদি আরবের মতো শক্তিশালী দলের সঙ্গে একই গ্রুপে পড়েও তিনটি ম্যাচে ড্র করে নকআউট পর্বে পৌঁছে গেছে তারা। ছোট দেশের এই সাফল্যে এখন গোটা ফুটবল বিশ্ব মুগ্ধ।
বুবিস্তার সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর ফুটবলার বাছাইয়ের দক্ষতা। তিনি শুধু দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা কেপ ভার্দের বংশোদ্ভূত ফুটবলারদের খুঁজে বের করেছেন। কেউ জার্মানিতে জন্মেছেন, কেউ নেদারল্যান্ডসে বড় হয়েছেন, কেউ আবার আমেরিকার ক্লাবে খেলেছেন। সবাইকে এক সুতোয় গেঁথে গড়ে তুলেছেন শক্তিশালী দল।
সবচেয়ে অবাক করা বিষয়, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা ফুটবলারদের খুঁজে বের করতে তিনি ব্যবহার করেছিলেন সমাজমাধ্যমভিত্তিক পেশাদার যোগাযোগের একটি মাধ্যম। অনেকেই সেই সিদ্ধান্তকে নিয়ে হাসাহাসি করেছিলেন। কিন্তু সেই পথই শেষ পর্যন্ত কেপ ভার্দেকে বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে এনে দিয়েছে।
এবার নকআউট পর্বে তাদের সামনে আর্জেন্টিনা। যে দেশের মারাদোনাকে দেখে ফুটবলের প্রেমে পড়েছিলেন বুবিস্তা, এবার সেই দেশের অধিনায়ক লিওনেল মেসির দলকেই চ্যালেঞ্জ জানাতে চলেছেন তিনি। ম্যাচের আগে বুবিস্তা বলেছেন, আমাদের কাছে অসম্ভব বলে কিছু নেই। এই দল যা করেছে, তাতেই আমরা গর্বিত। ফল যাই হোক, আর্জেন্টিনার মতো দলের বিরুদ্ধে খেলতে পারাটাই আমাদের কাছে বড় সম্মানের। তাঁর বিশ্বাস, ফুটবলে স্বপ্ন দেখার অধিকার সবার আছে, আর সেই স্বপ্ন একদিন বাস্তবও হতে পারে। সেই বিশ্বাস নিয়েই ইতিহাস লিখছে কেপ ভার্দে।







