সৌদি আরবে হুথিদের হামলার পর নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে পাকিস্তান (Pakistan), সৌদি আরব ও তুরস্কের মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি। গত মাসে স্বাক্ষরিত এই চুক্তি পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে সক্রিয় হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন পাকিস্তানের (Pakistan)প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ। তাঁর বক্তব্য ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে শুরু হয়েছে নতুন জল্পনা।
মঙ্গলবার সৌদি আরবে হুথিদের হামলার পর খাজা আসিফকে (Pakistan) প্রশ্ন করা হয়, এই পরিস্থিতিতে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি কার্যকর হতে পারে কি না। তিনি জানান, ইয়েমেনের সংঘাত যদি সৌদি আরবের ভূখণ্ডে ছড়িয়ে পড়ে, তা হলে চুক্তির যৌথ প্রতিরক্ষা ধারা কার্যকর হতে পারে। তাঁর দাবি, চুক্তির বিষয়ে কোনও অস্পষ্টতা নেই। এক সদস্যের বিরুদ্ধে আগ্রাসনকে সব সদস্যের বিরুদ্ধে হামলা হিসেবে বিবেচনা করার কথা সেখানে বলা হয়েছে।
খাজা আসিফের (Pakistan) বক্তব্য, পাকিস্তান এই চুক্তির শর্তে আবদ্ধ এবং প্রয়োজন হলে তা মেনে চলবে। অর্থাৎ সৌদি আরবের উপর এমন কোনও হামলা হলে, যা চুক্তির শর্তের মধ্যে পড়ে, পাকিস্তান প্রতিক্রিয়া জানাতে বাধ্য বলে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন।
এর আগে ইসলামাবাদে সাংবাদিকদের সঙ্গেও একই ধরনের মন্তব্য করেছিলেন পাকিস্তানের (Pakistan) প্রতিরক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেছিলেন, সৌদি আরবের উপর হুথিদের হামলাকে পাকিস্তানের উপর হামলা হিসেবেই দেখা হবে। তাঁর বক্তব্য, ইয়েমেনের সংঘাত যদি সৌদি ভূখণ্ডে ছড়িয়ে পড়ে, তা হলে যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে খাজা আসিফ একইসঙ্গে জানিয়েছেন, এই চুক্তি আক্রমণাত্মক নয়। কোনও সদস্য দেশের বিরুদ্ধে আগ্রাসন হলে তিন সদস্য দেশ যৌথভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে—চুক্তির মূল বিষয় সেটিই। তিনি আরও জানান, চুক্তি না থাকলেও সৌদি আরবের উপর এমন হামলার ক্ষেত্রে পাকিস্তান (Pakistan) পাশে দাঁড়াত বলে তাঁর মত।
মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে পাকিস্তান, সৌদি আরব এবং তুরস্ক রয়েছে। এর আগে পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে একটি কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিও ছিল। নতুন মক্কা চুক্তির ভিত্তি সেই আগের প্রতিরক্ষা সহযোগিতার উপর তৈরি হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
তবে সৌদি আরব ও হুথিদের সংঘাত নতুন নয়। ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীর সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘর্ষ দীর্ঘদিনের। ২০১৫ সালে হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক হস্তক্ষেপ করেছিল সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। সেই অভিযান হুথিদের পুরোপুরি দমন করতে পারেনি। এরপর থেকে দুই পক্ষের মধ্যে মাঝেমধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশ হামলা হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েমেনের সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সৌদি আরবের বিভিন্ন পরিকাঠামো লক্ষ্য করে হুথিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার অভিযোগ উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ ও কিং ফয়সাল কেন্দ্রের সহযোগী গবেষক ওমর করিমের মতে, সৌদি আরবের উপর হুথিদের হামলা বড় ধরনের হুমকিতে পরিণত হলে মক্কা চুক্তি এবং পাকিস্তান-সৌদি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি—দুটিই কার্যকর হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তাঁর মতে, সৌদি আরবকে রক্ষার কোনও অভিযানে অংশ নেওয়ার জন্য পাকিস্তানের ইতিমধ্যেই সেখানে সামরিক উপস্থিতি রয়েছে এবং খাজা আসিফের বক্তব্যে রাজনৈতিক সদিচ্ছার ইঙ্গিতও মিলেছে।
তবে এই চুক্তির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা অন্য জায়গায় হতে পারে। জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মেহরান কামরাভার মতে, সৌদি আরব যদি হুথিদের বিরুদ্ধে ইয়েমেনে সরাসরি সামরিক অভিযান চালায়, তা হলে পাকিস্তান ও তুরস্ক সেই অভিযানে অংশ নেবে কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের ভূখণ্ড রক্ষা করা এবং ইয়েমেনে ঢুকে সামরিক অভিযান চালানো—দুটি বিষয় এক নয়। পাকিস্তান সৌদি আরবকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে চুক্তির শর্ত মেনে পাশে দাঁড়াতে পারে। কিন্তু সৌদি আরব যদি ইয়েমেনে নতুন করে স্থল অভিযান শুরু করে, তা হলে সেই আক্রমণাত্মক অভিযানে পাকিস্তানের সেনা অংশ নেবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
খাজা আসিফও জানিয়েছেন, হুথিরা রাষ্ট্রীয় বাহিনী নয়। তাই তাদের মোকাবিলা করার দায়িত্ব মূলত ইয়েমেনের কর্তৃপক্ষের উপর থাকা উচিত বলে তাঁর মত। একইসঙ্গে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে এবং সংঘাত ধীরে ধীরে থেমে যাবে।
ফলে সৌদি আরবের উপর হুথিদের হামলার জেরে পাকিস্তান মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি সক্রিয় করতে পারে কি না, তা এখন বড় প্রশ্ন। সৌদিকে রক্ষার ক্ষেত্রে পাকিস্তানের অবস্থান স্পষ্ট করার চেষ্টা থাকলেও ইয়েমেনে কোনও আক্রমণাত্মক অভিযানে ইসলামাবাদ ও আঙ্কারা কতটা অংশ নেবে, সেটিই শেষ পর্যন্ত এই চুক্তির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।












