ভণ্ডামির কোনও বিশ্বকাপ হলে নিঃসন্দেহে পাকিস্তানই (Pakistan) চ্যাম্পিয়ন হতো। এক দিকে ভারতের বিরুদ্ধে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ম্যাচ বয়কটের সিদ্ধান্ত, অন্য দিকে আবার ভারতীয় বংশোদ্ভূত বিশ্ব ব্যাঙ্ক প্রধান অজয় বাঙ্গাকে রাজকীয় সংবর্ধনা—এই দুই ছবিতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে পাকিস্তানের (Pakistan)দ্বিচারিতা। প্রশ্ন উঠছে, এই আতিথেয়তা কি ভারতীয় পরিচয়ের জন্য, না কি ঋণের চেকবই হাতে থাকার জন্য?
সম্প্রতি পাকিস্তান (Pakistan) সফরে গিয়েছিলেন বিশ্ব ব্যাঙ্কের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা। এই সফর মূলত ব্যক্তিগত হলেও, তাঁর অভ্যর্থনায় কোনও খামতি রাখেনি ইসলামাবাদ। কিন্তু বাস্তবতা হল, অর্থনৈতিক ভাবে প্রায় দেউলিয়া পাকিস্তান বিশ্ব ব্যাঙ্ক ও আইএমএফ-এর ঋণের উপরেই কার্যত দাঁড়িয়ে রয়েছে। সেই কারণেই বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ঋণদাতার প্রধানকে খুশি রাখতেই এই অতিরিক্ত আতিথেয়তা বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, বিশ্ব ব্যাঙ্ক ১৯৬০ সালের সিন্ধু জলচুক্তির এক স্বাক্ষরকারী এবং মধ্যস্থতাকারী। পহেলগাঁওয়ে জঙ্গি হামলার পর ভারত ওই চুক্তি স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। এর ফলে পাকিস্তান (Pakistan) গভীর সঙ্কটে পড়ে, কারণ তাদের কৃষির প্রায় ৮০ শতাংশই নির্ভর করে সিন্ধু নদী ব্যবস্থার উপর। কৃষি ক্ষেত্রই পাকিস্তানের খাদ্য নিরাপত্তার মেরুদণ্ড, যা দেশের মোট জিডিপির প্রায় ২৫ শতাংশ।
গত নয় মাসে এই জলচুক্তি নিয়ে পাকিস্তান একাধিক আন্তর্জাতিক মঞ্চ ও আদালতের দ্বারস্থ হলেও তাতে বিশেষ সাফল্য আসেনি। তাই বিশ্ব ব্যাঙ্ক নেতৃত্বের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতেই অজয় বাঙ্গাকে ঘিরে এত আড়ম্বর বলে মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল। যদিও গত বছর অজয় বাঙ্গা স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, সিন্ধু জলচুক্তি নিয়ে কোনও মীমাংসার ভূমিকা বিশ্ব ব্যাঙ্ক নেবে না, তারা কেবলমাত্র একটি মধ্যস্থতাকারী।
এই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানে বাঙ্গার অভ্যর্থনা ঘিরে বিতর্ক আরও বেড়েছে। পাকিস্তান তাঁকে ‘নিজেদের মানুষ’ হিসেবে তুলে ধরারও চেষ্টা করেছে। অথচ অজয় বাঙ্গার জন্ম ভারতের পুনেতে, ১৯৫৯ সালে। দেশভাগের সময় তাঁর পরিবার ভারতেই চলে আসে। তাঁর বাবা হরভজন সিং বাঙ্গা ছিলেন ভারতীয় সেনার অফিসার।
চার দিনের সফরে বাঙ্গা যান পাঞ্জাবের খুশাব জেলায়, যেখানে একসময় তাঁর পরিবার থাকত। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে ঘোড়সওয়ার বাহিনী, ব্যান্ডপার্টি, রাস্তার দু’ধারে দাঁড়ানো পড়ুয়া, বিশাল ব্যানার। এমনকি বাজানো হয় বলিউডের গান ‘মেরা পিয়া ঘর আয়া’। তাঁকে স্বাগত জানান পাকিস্তানের অর্থমন্ত্রী মহম্মদ আওরঙ্গজেব ও পাঞ্জাবের সংখ্যালঘু মন্ত্রী। ছবিতে দেখা যায়, পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী মরিয়ম নওয়াজ শরিফের সঙ্গে বাঙ্গার বিশাল পোস্টারও টাঙানো হয়েছে।
সবচেয়ে বিতর্ক তৈরি করেছে একটি প্রতীকী ঘটনা। পাকিস্তানের তরফে অজয় বাঙ্গাকে তাঁর পৈতৃক বাড়ির নথির অনুলিপি উপহার দেওয়া হয়—যে বাড়ি ছেড়ে দেশভাগের সময় তাঁর পরিবার পালাতে বাধ্য হয়েছিল। অনেকের মতে, এই আচরণ শুধু সংবেদনশীলতাহীনই নয়, চরম ভণ্ডামির উদাহরণ।
সফরের শেষ দিনে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন বিশ্ব ব্যাঙ্ক প্রধান। আলোচনার মূল বিষয় ছিল আগামী দশ বছরে বিশ্ব ব্যাঙ্কের কাছ থেকে ২০ বিলিয়ন ডলার আর্থিক সহায়তা পাওয়ার চেষ্টা। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের মোট বিদেশি ঋণ প্রায় ১৩৫ বিলিয়ন ডলার, যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশই বিশ্ব ব্যাঙ্কের কাছে বাকি।
এই বৈঠকের কিছুদিন আগেই শাহবাজ শরিফ প্রকাশ্যে স্বীকার করেছিলেন, বিদেশে গিয়ে ঋণের জন্য দরবার করতে গিয়ে তিনি লজ্জিত বোধ করেন। তিনি বলেছিলেন, সেনাপ্রধান আসিম মুনির ও তাঁকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গিয়ে টাকা চাইতে হয়, যা আত্মসম্মানে আঘাত করে।
এই ঘটনার পর সামাজিক মাধ্যমে তীব্র কটাক্ষ শুরু হয়েছে। অনেক পাকিস্তানিও প্রশ্ন তুলেছেন, কেন একজন ‘ব্যাঙ্ক কর্মচারী’-কে এত রাজকীয় সম্মান দেওয়া হল। কেউ লিখেছেন, ভারতবিদ্বেষ দেখানো পাকিস্তান আবার ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্যক্তির সামনেই মাথা নোয়াল। আবার কেউ ১৯৭১ সালের আত্মসমর্পণের প্রসঙ্গ টেনে এনে বিদ্রূপ করেছেন।
সব মিলিয়ে, ভারতের বিরুদ্ধে ক্রিকেট বয়কট আর ঋণের জন্য ভারতীয় বংশোদ্ভূত বিশ্ব ব্যাঙ্ক প্রধানের সামনে লাল গালিচা—এই দুই বিপরীত ছবিতে পাকিস্তানের দ্বিচারিতাই আরও এক বার প্রকাশ্যে এল।











