বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump)। বৃহস্পতিবার দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের মঞ্চে তিনি প্রকাশ্যে আনলেন তাঁর প্রস্তাবিত ‘বোর্ড অব পিস’। কিন্তু এই উদ্যোগের সূচনালগ্নেই প্রশ্নের মুখে পড়ল তার গ্রহণযোগ্যতা। কারণ, ভারতের অনুপস্থিতির মধ্যেই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফকে পাশে বসিয়ে এই বোর্ডের উদ্বোধন করলেন ট্রাম্প (Donald Trump)।
সুইৎজারল্যান্ডের দাভোসে আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে সব কিছুই ছিল পরিকল্পনামাফিক। রাষ্ট্রনেতারা জোড়ায় জোড়ায় এসে ট্রাম্পের (Donald Trump)পাশে বসেন এবং বোর্ডের চার্টারে সই করেন। ট্রাম্পের ডান দিকে বসেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। দু’জনের করমর্দন ও সংক্ষিপ্ত কথোপকথন ক্যামেরাবন্দি হতেই নতুন করে নজর কাড়ে গোটা বিষয়টি।
এই অনুষ্ঠানে ভারতের অনুপস্থিতি স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে। জানা গিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে এই বোর্ডে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হলেও ভারত সেই প্রস্তাবে না সম্মতি দিয়েছে, না প্রত্যাখ্যান করেছে। বিষয়টি এখনও বিবেচনাধীন বলেই সূত্রের খবর। তবে পাকিস্তানের উপস্থিতিতে ভারতের না যাওয়ার সিদ্ধান্ত দিল্লির পক্ষে স্বস্তিকর হয়নি বলেই মনে করছে কূটনৈতিক মহল। বিশেষ করে জম্মু ও কাশ্মীরের পহেলগামে জঙ্গি হামলার ঘটনার পর পাকিস্তানের ভূমিকা নিয়ে ভারত যে বারবার প্রশ্ন তুলেছে, সেই প্রেক্ষাপটে এই ছবি তাৎপর্যপূর্ণ।
ভারতীয় আধিকারিকদের মতে, প্রস্তাবটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ভূরাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত বিষয় জড়িত থাকায় সতর্ক অবস্থান নিয়েছে নয়াদিল্লি। ভারত বরাবরই প্যালেস্টাইন প্রশ্নে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের পক্ষে এবং ইজরায়েল ও প্যালেস্টাইনকে স্বীকৃত সীমার মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
এই বোর্ডে পাকিস্তান ছাড়াও সদস্য হয়েছে আর্জেন্টিনা, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, বাহরিন, বেলারুশ, মিশর, হাঙ্গেরি, কাজাখস্তান, মরক্কো, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, সৌদি আরব এবং ভিয়েতনাম। জার্মানি, ইতালি, রাশিয়া, ইউক্রেন, তুরস্ক-সহ একাধিক দেশ এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ফের একবার বিতর্কিত মন্তব্য করেন ট্রাম্প। তিনি দাবি করেন, তাঁর হস্তক্ষেপেই ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্ভাব্য যুদ্ধ এড়ানো গিয়েছিল। তাঁর এই দাবি আগেও খারিজ করেছে ভারত। ট্রাম্প বলেন, ভারত ও পাকিস্তান—দু’টি পরমাণু শক্তিধর দেশের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছিল, যা তিনি থামিয়েছেন। এই মন্তব্যের সূত্রপাত ২০২৫ সালের মে মাসে ‘অপারেশন সিন্দুর’-এর পরবর্তী উত্তেজনা থেকে, যেখানে ভারত পাকিস্তান ও পাক-অধিকৃত কাশ্মীরে জঙ্গি ঘাঁটিতে নিখুঁত হামলা চালিয়েছিল।
ট্রাম্পের দাবি, ‘বোর্ড অব পিস’ একটি আন্তর্জাতিক সংগঠন, যার লক্ষ্য সংঘর্ষপীড়িত এলাকায় স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। শুরুতে গাজা পুনর্গঠনের জন্য ভাবা হলেও পরে এর কাজের পরিধি বাড়ানো হয়েছে। ট্রাম্প বলেন, এই বোর্ড রাষ্ট্রপুঞ্জের সঙ্গে মিলেই কাজ করবে, যদিও কূটনীতিকদের একাংশের আশঙ্কা, এতে রাষ্ট্রপুঞ্জের ভূমিকা দুর্বল হতে পারে।
এই উদ্যোগে এখনও পর্যন্ত রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদের কোনও স্থায়ী সদস্য দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেয়নি। ফ্রান্স ইতিমধ্যেই না জানিয়েছে, ব্রিটেন আপাতত দূরে রয়েছে, চিন এখনও অবস্থান স্পষ্ট করেনি। রাশিয়া বিষয়টি খতিয়ে দেখছে বলে জানিয়েছে।
এই বোর্ডের কার্যকরী কমিটিতে রয়েছেন মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিও, প্রাক্তন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার, ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার, বিশ্ব ব্যাঙ্কের প্রধান অজয় বঙ্গা-সহ একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি। তাঁদের দায়িত্ব গাজা পুনর্গঠন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা। এই উদ্যোগ এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন গাজায় যুদ্ধবিরতি অত্যন্ত নড়বড়ে অবস্থায় রয়েছে।











