নেপালের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত মিলছে (Nepal Election)। সাধারণ নির্বাচনের ভোটগণনা চলতে চলতেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে এক তরুণ নেতার উত্থান। কাঠমান্ডুর প্রাক্তন মেয়র বালেন্দ্র শাহ, যিনি বালেন শাহ নামেই বেশি পরিচিত, তিনি এখন নেপালের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে অনেকটাই এগিয়ে। রাজনীতির মঞ্চে তাঁর এই দ্রুত উত্থান ইতিমধ্যেই আলোড়ন ফেলেছে গোটা দেশে।
প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে নিজের প্রচার শুরু করেছিলেন তিনি একেবারেই ভিন্নভাবে (Nepal Election)। তাঁর প্রথম বড় ভাষণ শুরু হয়েছিল মৈথিলী ভাষায়। বক্তব্যের শুরুতেই তিনি জনকীর উদ্দেশে প্রণাম জানান। প্রচারও শুরু করেন কাঠমান্ডু বা পাহাড়ি এলাকা থেকে নয়, বরং মধেশ প্রদেশের রাজধানী জনকপুর থেকে। এই শহরকেই সীতার জন্মস্থান বলে মনে করা হয়। নেপালের রাজনীতিতে এত বড় নেতা প্রথম ভাষণে মৈথিলী ব্যবহার করেছেন—এমন ঘটনা খুবই বিরল (Nepal Election)।
শুক্রবার অনুষ্ঠিত নেপালের সাধারণ নির্বাচনের (Nepal Election) ভোটগণনা চলতে থাকায় দেখা যাচ্ছে বালেন শাহের দল জাতীয় স্বাধীনতা পার্টি অনেক আসনে এগিয়ে রয়েছে। সংসদের মোট আসনের বড় অংশেই তারা লিড করছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। নিজেও পূর্ব নেপালের ঝাপা আসনে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলির বিরুদ্ধে বড় ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছেন বলে খবর।
এই নির্বাচনে নেপালের ছয়জন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে তুলনায় নতুন মুখ হয়েও বালেন শাহ অভিজ্ঞ নেতাদের কড়া চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অলির শক্ত ঘাঁটি হিসেবেই পরিচিত ঝাপা আসন থেকেই লড়াই করার সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
বালেন শাহের উত্থান নেপালের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিতে পারে বলেই মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক। দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ি অঞ্চলের ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় সম্প্রদায়ের নেতারাই রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করেছেন। সেই প্রেক্ষাপটে মধেশি সম্প্রদায় থেকে উঠে আসা একজন নেতার সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হওয়া একটি বড় রাজনৈতিক বার্তা বহন করতে পারে।
মধেশি সম্প্রদায়ের মানুষ মূলত নেপালের দক্ষিণের সমতল অঞ্চলে বাস করেন, যা ভারতের সীমান্তঘেঁষা এলাকা। এই অঞ্চলের বহু মানুষ মৈথিলী, ভোজপুরী, অবধি এবং হিন্দি ভাষায় কথা বলেন। বহু বছর ধরেই রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও অধিকারের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে আসছেন তাঁরা। সেই কারণে মধেশি সম্প্রদায় থেকে একজন প্রধানমন্ত্রী হওয়া নেপালের রাজনীতিতে ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
বালেন শাহের জন্ম উনিশশো নব্বই সালের সাতাশে এপ্রিল কাঠমান্ডুর নারাদেবী এলাকায়। তাঁর পরিবার মূলত মধেশ প্রদেশের মহোত্তরি জেলার বাসিন্দা ছিল, পরে তারা কাঠমান্ডুতে চলে আসে। তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবেই তাঁকে দেখা হচ্ছে, কারণ নেপালের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই বয়সে অনেক বেশি নেতাদেরই আধিপত্য ছিল।
রাজনীতিতে আসার আগে বালেন শাহ ছিলেন জনপ্রিয় র্যাপার। গান গাইতেন ‘বালেন’ নামেই। তাঁর গানের কথায় প্রায়ই উঠে আসত সমাজের নানা সমস্যা, দুর্নীতি এবং শহরের অব্যবস্থার কথা। এই কারণেই তরুণদের মধ্যে তিনি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।
দুই হাজার বাইশ সালে নির্দল প্রার্থী হিসেবে কাঠমান্ডুর মেয়র নির্বাচনে লড়ে সবাইকে চমকে দিয়ে জয়ী হন তিনি। সেই নির্বাচনে বড় বড় রাজনৈতিক দলের প্রার্থীদের হারিয়ে দেন বালেন শাহ। এরপর মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময় শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, যানজট নিয়ন্ত্রণ এবং অবৈধ দখলদারি সরানোর মতো নানা বিষয়ে কাজ করেন তিনি। পুরনো ঐতিহ্যবাহী স্থানের সংস্কার এবং নতুন পার্ক তৈরির উদ্যোগও নেন।
তবে তাঁর কিছু কঠোর পদক্ষেপ নিয়েও সমালোচনা হয়েছিল। নদীর ধার থেকে অবৈধ বসতি উচ্ছেদ এবং বেআইনি নির্মাণ ভাঙার মতো সিদ্ধান্তকে অনেকেই কঠোর বলে মনে করেছিলেন। তবু শহর পরিষ্কার ও সুশৃঙ্খল করার উদ্যোগে অনেকের প্রশংসাও পেয়েছেন তিনি।
এই বছরের জানুয়ারিতে মেয়রের পদ ছেড়ে জাতীয় রাজনীতিতে নামেন বালেন শাহ। এরপর জাতীয় স্বাধীনতা পার্টিতে যোগ দিয়ে সাধারণ নির্বাচনে লড়াই করার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর নির্বাচনী প্রচারে গুরুত্ব পেয়েছে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই, তরুণদের ক্ষমতায়ন এবং শক্তিশালী ফেডারেল কাঠামোর প্রতিশ্রুতি।
জনকপুরে মৈথিলী ভাষায় ভাষণ দিয়ে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগও স্থাপন করেন তিনি। সেই ভাষণে তিনি মধেশ অঞ্চলের মানুষের দাবি ও স্বার্থ রক্ষার প্রতিশ্রুতি দেন। তরুণ প্রজন্মের সমর্থন, দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান এবং নতুন রাজনৈতিক ভাবনা—সব মিলিয়ে নেপালের রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে আলোচিত নাম হয়ে উঠেছেন বালেন শাহ। অনেকেই মনে করছেন, যদি তিনি প্রধানমন্ত্রী হন, তবে দেশের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে।







